জল শাড়ী Valobasar golpo

Share
Valobasar golpo “বৃষ্টির জলে খুঁজিতেছি আমি আমার সকল সুখ দেখিতে পাই না কিংবা চাই না জলে ভিজে থাকা দুখ” আমার মা রহিমা খাতুন-রহিমা খালা হিসেবেই যিনি কর্মক্ষেত্রে সবার নিকট পরিচিত।বছর পাঁচেক আগ পর্যন্ত অবশ্য শুধুই রহিমা ছিলেন,কিন্তু বয়স এবং ছেলেকে মানুষ করা-এই দুয়ের ভারে সময়ের আগেই যেদিন থেকে চুলে হালকা পাক ধরা শুরু হলো,হাতের চামড়া কুচকে যেতে লাগল,গাল বসে যেতে লাগল,সেদিন থকেই তিনি “রহিমা” থেকে “রহিমা খালা”তে রুপান্তর হতে লাগলেন।

আজ তিনি একজন পরিপুর্ন রহিমা খালা,যার কাজ ‘ধানক্ষেত’ বুটিক শপের বারজন Valobasar golpo সেলসম্যান সেলসগার্লের দুপুরের খাবার,বিকেলের চা নাস্তা ইত্যাদি তৈরি করে দেওয়া।বিনিময়ে মাস শেষে তিন হাজার টাকা ,দুই ঈদে পাঁচশ টাকা দামের দুটো শাড়ী ফ্রী পান।তিনি অবশ্য পাঁচশ টাকা দামের শাড়ী না নিয়ে তিনশ টাকা দামের ছেড়া শাড়ী একশ টাকা দিয়ে নিয়ে বেচে যাওয়া টাকাগুলো তাঁর ছেলের হাতে তুলে দ্যান।কেন ? কারন,তাঁর ছেলের যে একটা রোদ চশমা না হলে চলছে না।প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনে ভাল একটা গিফট না দিলে তাঁর ছেলের মান ইজ্জত কি থাকবে ?আর ছেলের মান ইজ্জত মানে তো নিজের মান ইজ্জত,তাই না ?তার উপর তাঁর ছেলে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ভার্সিটিতে শীর্ষস্থানীয় একটি বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করছে।এই সময় সে যদি একটু পরিপাটি করে না চলে তবে কিভাবে হবে !
আমিও আমার মা’র সম্মান বাড়াতে পরিপাটি হয়ে চলি।টেক্সমার্ট থেকে শার্ট,অ্যাপেক্স থেকে জুতো কিনি।ঈদে বন্ধুদের সাথে কক্স বাজার,রাঙ্গামাটি বেড়াতে যাই।ডোমিনাসে গিয়ে বন্ধুর জন্মদিন সেলিব্রেট করি।এবং সব শেষে বাসায় এসে যখন দেখি আমার মা তাঁর সন্তানের সম্মান বাড়াতে গিয়ে নিজের সম্ভ্রম ঢেকে রাখার একমাত্র অবলম্বন শাড়ী দুটোর ছেড়া অংশ সেলাইয়ে ব্যস্ত তখন সাত ফিট বাই পাঁচ ফিট ঘরটাতে ঢুকে দরজা লাগিয়ে অনেকক্ষন কাঁদি এবং ভাবি,আমাকে কিছু একটা করতেই হবে . . .করতেই হবে . . .করতেই হবে . . . . .
চার বছর পর . . .
আজ আমি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যক্তি।মাস ছয়েক আগে মাস্টার্স সম্পুর্ন করেValobasar golpo  একটা বেসরকারি ব্যাংকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করেছি।এখন আর আমার মা’র ‘ধানক্ষেত’ বুটিক শপে কাজ করতে হয় না।চাকরীতে জয়েন করেই একটা বড় বাসা ভাড়া নিয়েছি।বেতন যা পাই,তাতে আমাদের মা ছেলের সুন্দর মত চলার পরও একটা বড় অংকের টাকা ব্যাংকে জমা রাখতে পারি।
ঊনত্রিশে রমজান . . .
ওহ গড ! গত কয়েকটা দিন আমার উপর দিয়ে যেই ধকল গিয়েছে।ব্যাংকের চাকরী মানুষে করে ! আর মানুষও ঈদের সীজন আসলে মনে হয় টাকা তোলার জন্য পাগল হয়ে যায়।গতকাল তো রাত দশটা পর্যন্ত অফিস করতে হয়েছে।রোজা রেখে রাত দশটা পর্যন্ত অফিস করা যায় ? যাক,তাও ভাল যে,আজকে অফিস করতে হয়নি।আজ সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছি।এখন ইফতার করে মাকে নিয়ে যাব শপিংয়ে।
‘কি হলো মা ! হয়েছে তোমার ?’
‘এইত বাবা,পানটা মুখে দিয়া নামতেছি।’
‘ওফ ! এই সময় তোমার পান খেতে হয় !এদিকে ক্যাবওয়ালা তাড়া দিচ্ছে।’
‘এই যে বাবা হয়ে গেছে’-বলে ওড়নাটা মাথায় পেচাতে পেচাতে মা নেমে আসেন।গাড়ীতে উঠে মা আমার গ্যাজর গ্যাজর করতে থাকেন।
‘আমাকে নিয়ে মার্কেটে যেতে হবে কেন ! তুই একটা শাড়ী পছন্দ করে নিয়ে আসলেই তো পারিস, . . .’
গাড়ী মিরপুরের ধানক্ষেত বুটিক শপের সামনে আসতেই আমি ড্রাইভারকে থামতে বলি।গাড়ী থামতেই ভাড়া মিটিয়ে মাকে নিয়ে নেমে আসি।মা তাঁর পুর্ব ঠিকানা দেখে কেমন যেন শঙ্কিত হয়ে উঠেন।হয়ত তাঁর অতীতের কষ্টের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।
‘কিরে বাবা,এখানে নিয়ে আসছোস কেন ?’
‘আসো,ভেতরে আসো।’আমি মা’র প্রশ্নের উত্তরটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে মাকে ভেতরে নিয়ে যাই।মা ভেতরে ঢুকতেই তাঁর পরিচিত একজন সেলস গার্ল ‘আরে রহিমা খালা যে !কেমন আছো ?’-বলে মা’র দিকে এগিয়ে আসে।মা সেই সেলস গার্লের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি মেশানো একটা হাসি দেয়।অন্যান্য সেলস ম্যান,সেলস গার্লরাও সেই সেলস গার্লের ‘আরে রহিমা খালা যে !’ শুনে মা’র দিকে তাকায়।তাদের অনেকেই হয়ত মা’র পরিচিত,কিন্তু আর কেও মা’র কাছে আসে না।একজন এক সময়ের সামান্য রাধুনীর জন্য তো আর চাঁন রাতের ব্যবসাটা মাটি করা যায় না,তাই না ?
আমি মা’র কাছে আসা সেলস গা্লকে উদ্দেশ্য করে বলি-‘আপনাদের শাড়ীর এক্সপেন্সিভ কালেকশনটা দেখা যাবে ?’
‘ওহ ! শিওর স্যার।কার জন্য স্যার ? আপনার ওয়াইফের জন্য ?’
‘জ্জী না,আপনাদের রহিমা খালার জন্য।’সেলস গার্ল আমার কথায় হকচকিয়ে গিয়ে মা’র দিকে তাকায়।
‘আমার ছেলে।একটা বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।’লাজুক কন্ঠে বলে উঠেন মা।যেন বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হওয়াটা খুবই লজ্জার।তারপর আমার দিকে তাকান।
‘দামী শাড়ী কেন ?আমার কি দামী শাড়ী পড়ার বয়স আছে ? কুমকুম আপা,আপনে বরং দুইটা সূতির শাড়ী নিয়া আসেন।আমার পছন্দ তো আপনে জানেন।আমি আর এই ভিড়ের ভেতর ঘুরাফেরা করলাম না।’আমি আমার চোয়াল শক্ত করে কুমকুম নামের সেলস গার্লের দিকে তাকিয়ে বল্লাম-‘আমি যেটা বলেছি সেটা করুন।’আমার বলার ধরনের কারনেই হোক আর বেশি দামের শাড়ী বিক্রির লোভেই হোক,আমাদের মা ছেলেকে ক্যাশ কাউন্টারের পাশে দুটো চেয়ারে বসিয়ে এক ছুটে গেলো শাড়ী আনতে।বুটিক শপের মালিক রুমানা ইয়াসমিন(যাকে আমি আগে থেকেই চিনি) আমরা দোকানে ঢুকতেই মাকে লক্ষ করেছিল,কিন্তু পাত্তা দেয়নি।এখন কুমকুমের কাছে দামী শাড়ীর কথা শুনে শত ব্যস্ততার মাঝেও মা’র দিকে নজর দেয় !
‘আরে রহিমা যে ! কি,শাড়ী কিনতে আসছো ?’বলতে বলতেই কুমকুম তিনটা শাড়ী নিয়ে আসে।
‘এই যে খালা,তিনটা আনলাম।তিনটাই দামী শাড়ী।এখন দেখেন(সম্বোধন ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’তে নিয়ে আসছে) কোনটা আপনার পছন্দ হয়।’
‘কোনটার দাম কত ?’প্রশ্ন করি আমি।
‘অ্যাশ কালারটা তের হাজার ছয়শ উইথ ভ্যাট,বাদামিটা এগার হাজার উইথ ভ্যাট আর এই অফ হোয়াইটটা আমাদের মোস্ট এক্সপেন্সিভ কালেকশন,সেভেনটিন থাউজেন্ড উইথ ভ্যাট।’
‘এটাই প্যাক করে দ্যান।’
রুমানা ইয়াসমিন শাড়ীর দাম রাখার সময় পাঁচশ টাকা রিটার্ন দিয়ে বলেন-‘নেন(যথারীতি সম্বোধন পরিবর্তন) রহিমা,এইটা আপনাকে স্পেশাল ডিসকাউন্ট দিলাম।’আমি রুমানার দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বলি-‘আমার মা সারা জীবন ডিসকাউন্টে শাড়ী কিনে পড়েছে।আমি চাই না এই শাড়ীটাও উনি ডিসকাউন্টে কিনুক।’কথাগুলো বলে আমি মাকে নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে আসি।
অনেকক্ষন গাড়ীর জন্য দাঁড়িয়ে থেকেও কোন গাড়ী না পেয়ে একটা রিকশা নেই।
কিছুক্ষন আগে শা’ওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গিয়েছে।অডিও ক্যাসেটের দোকান থেকে নিয়ে মোবাইলের রিংটোন-সবখানে একযোগে বেজে চলছে,”ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ ! . . . ।” বাংলাদেশের সমস্ত অলিতে গলিতে যেন আনন্দের রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে কেও।মা শাড়ীর প্যাকেটটা দু হাতে শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়ছে।আমার খুব ইচ্ছে করছে মা’র চোখের জলটা মুছে দিতে,কিন্তু আমি তা করি না।কিছু কিছু জল আছে যে জল কখনও মুছতে নেই।